স্টাফ রিপোর্টার : ময়মনসিংহে জমে উঠেছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এই নির্বাচনে নানা প্রতিশ্র“তির মাঝে অন্যতম যানজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ভোট প্রত্যাশা করছে মেয়র প্রার্থীরা।

নির্বাচনকে সামনে রেখে নগরবাসীর মধ্যে ঘুরে ফিরে এই দুটি প্রধান সমস্যা নিয়ে আলোচনা চলছে। ভোট চাইতে আসা প্রার্থীদের কাছ থেকে যানজট ও জলবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্র“তি চাচ্ছেন ভোটাররা। মেয়র প্রার্থীসহ কাউন্সিলর প্রার্থীরাও এবার এক সুরে যানজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন।

ভোটারদের প্রত্যাশা হচ্ছে নগরীর দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা যানজট ও জলবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সক্ষমতা রয়েছে এমন যোগ্য প্রার্থীকেই তারা এবারের নির্বাচনে বেছে নিতে চান।

ফলে নির্বাচনে ভোট ফ্যাক্টর হতে পারে নগরীর অসহনীয় যানজট ও মৌসুমি জলাবদ্ধতার সমস্যা।

এবারের নির্বাচনে মাঠে প্রতিদ্ব›দ্ধীতা করছেন পাঁচজন মেয়র প্রার্থী। তারা হলেন, সদ্য বিদায়ী মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি টেবিল ঘড়ি প্রতীকের ইকরামুল হক টিটু, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ঘোড়া প্রতীকের এহতেশামুল আলম, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হাতি প্রতীকের সাদেকুল হক খান মিল্কী টজু, জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহবায়ক ও জেলা শ্রমিক পার্টির সভাপতি লাঙ্গল প্রতীকের শহীদুল ইসলাম স্বপন মন্ডল ও রেজাউল হক হরিণ প্রতীকের প্রার্থী।

মেয়র প্রার্থী মো. ইকরামুল হক টিটু বলেন, ময়মনসিংহ নগরীর দুর্ভোগের নাম ও সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে সিটি কর্তৃপক্ষ ১৬ কিলোমিটার খাল সংস্কার ও অবৈধ দখলদার থেকে মুক্তসহ নগরীতে ১৬৯ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করেছেন। এতে নগরীর উত্তর পাশের বাসিন্দারা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। নগরীর দক্ষিণ ও পশ্চিমের বাসিন্দাদের জন্য ড্রেন নির্মাণ ও খাল সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে নগরবাসী জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাবে।

তিনি আরো বলেন, সিটির উন্নয়নের অসমাপ্ত কাজ করতে নগরবাসী আবারও তার প্রতি আস্থা রাখবে। বিগত পাঁচ বছরে প্রথম দিকে মহামারি করোনা ও পরে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে শতভাগ উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ মানুষ আমার প্রতি তাদেরর সমর্থন দিলে যানজট জলাবদ্ধতাসহ চলমান উন্নয়ন কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারবো।

হাতি প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাদেকুল হক খান মিল্কী টজু সম্প্রতি ১৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষনা করেছেন। ইশতেহারের মাঝে অন্যতম হলো যানজট সমস্যার নিরসন ও আধুনিক ড্রেনেজ নির্মান করা।

তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সিটি কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির কারণেই জলবদ্ধতার থেকে মুক্তি পাচ্ছে না নগরবাসী। তিনি ভোটারদের কাছে গিয়ে নানা প্রতিশ্র“তির পাশাপাশি নগরীর যানজট সমস্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন।

প্রতীক ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ্ব এহতেশামুল আলম সাংবাদিক সম্মেলন করে ২০ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষনা করেছেন। এর মাঝে নগরের অভ্যন্তরে গণপরিবহনের টেকসই সমাধান, নগরের অভ্যন্তরে ট্রাক ও ভারী যানবাহন চলাচলের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিজ্ঞানসম্মত টেকসই উপায়ে আধুনিকায়নের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী শহীদুল ইসলাম স্বপন মন্ডল বলেন, যানজটে আটকা পড়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘন্টা। নগরীর গুরুত্বপূর্ন সড়কগুলোতে যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এছাড়াও প্রতিবছর বর্ষায় নগরীতে জলাবদ্ধতা তৈরী হয়। এই দুইটি অন্যতম সমস্যা সমাধানে আমার বিশেষ অঙ্গীকার রয়েছে।

হরিণ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী কৃষিবিদ ড. রেজাউল হক বলেন, নগরীর প্রতিটি এলাকায় গনসংযোগ করছি। নগরীর যানজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যাসহ নানা বিষয় সমাধানে প্রতিশ্র“তিতে মানুষের কাছে ভোট চাচ্ছি। সাধারন মানুষের ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি। বিগত সময়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। আমি নির্বাচিত হলে জনগনকে সাথে নিয়ে যানজট জলাবদ্ধাতা মুক্ত আধুনিক, স্মার্ট নগরী গড়ে তুলব।

ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আমীন কালাম জানান, এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী প্রত্যকেই যানজট সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সমাধানের প্রতিশ্র“তি নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। নগরবাসী যানজট পরিস্থিতি নিয়ে অসহনীয় দিন যাপন করছে। এবারের নির্বাচনে যানজট সমস্যার প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি ভোট ফ্যাক্টর হতে পারে নগরীর এই যানজট ও জলাবদ্ধতার সমস্যা। যানজটে আটকা পড়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘন্টা।

নগরবাসীর অভিযোগ, ট্রাফিক বিভাগের নানা অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরাঢনের কারণে বিশ্বের ২০টি ধীর গতির শহরের তালিকায় নবম ধীরগতির শহরে পরিণত হয়েছে ময়মনসিংহ। দেশে ধীরগতির তালিকায় ময়মনসিংহ নগরীর অবস্থান রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরেই, তিন নম্বরে। বিশ্বের ১৫২ টি দেশের ১ হাজার ২০০ টির বেশি শহরে যান চলাচলের গতি বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

নগরবাসী আরো বলেন, গত বর্ষা মৌসুমেও দেখা গেছে একদিনের রেকর্ড ভারী বর্ষণে নগরীর বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল। এ সময় নগরীর ব্রাহ্মপল্লী, ভাটিকাশর, বলাশপুর, চরপাড়া, মাসকান্দা, নওমহল, কাঁচিঝুলি ও সানকিপাড়া এলাকাসহ আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর ময়মনসিংহ যে হারে মানুষ ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে সে তুলনায় বাড়েনি রাস্তাঘাট। উল্টো ময়মনসিংহ সিটি ঘোষণা ও বিভাগে উন্নীত হওয়ার পর ময়মনসিংহ নগরীতে অপ্রশস্ত সরু প্রধান ও অলিগুলির প্রতিটি সড়কে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা যানজট ও জলবদ্ধতার সংকটকে আরো তীব্র করে তোলে। মূল সিটির ভেতরে প্রায় অর্ধশত লেভেল ক্রসিং এ প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা আটকা পড়া যানবাহন নগরবাসীর জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে।