স্টাফ রিপোর্টার : ময়মনসিংহের মনতলা এলাকায় সেতুর নীচ থেকে উদ্ধার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ওমর ফারুক সৌরভের খুনে জড়িত ছিল তারই আপন চাচা। আর চাচাকে খুনে সহায়তা করেছে চাচা’র শ্যালক। খুনের পর লাশ নিয়ে ফেলা হয় মনতলা সেতুর নীচে। পুলিশ এ ঘটনায় চাচা ইলিয়াছ, তার শ্যালক ফারুক ও প্রাইভেট কারের চালক হান্নানসহ মোট ৩জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিং জেলা পুলিশ সুপার মাছুম আহম্মদ ভুইয়া এসব তথ্য জানান। পুলিশ সুপার বলেন, তিন বছর আগে ওমর ফারুক সৌরভের চাচাতো বোন ইসরাত জাহান ইভার বিয়ে হয় আব্রাহাম নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বর্তমানে কানাডায় স্টুডেন্ট ভিসায় পড়াশোনা করছেন। তার সঙ্গে ডিভোর্সও হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি সৌরভ গোপনে তার চাচাতো বোন ইভাকে বিয়ে করেন। এই বিষয়টি ইভার পরিবার ভালোভাবে নেয়নি।

গত ১ জুন সৌরভকে বাসায় ডেকে আনে চাচাতো ভাই মৃদুল। সৌরভ ফোন পেয়ে চাচা ইলিয়াছের ময়মনসিংহ নগরীর গোহাইলকান্দি বাসাতে আসে। এরপর সৌরভকে মাথায় আঘাত করে খুন করে চাচা ইলিয়াছ ও তার শ্যালক ফারুক। এরপর লাশ বাথরুমে নিয়ে চাপাতি দিয়ে টুকরো করা হয়। ফিঙ্গার প্রিন্ট নষ্ট করে দেয়া হয়। খুনে ব্যবহার করা হয় হ্যান্ড গ্লাভস। রাত সাড়ে ১২টার দিকে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করে লাগেজ ভর্তি লাশ ফেলে আসা হয় মনতলা সেতুর নীচে।

গত ১ জুন রবিবার সকালে মনতলা সেতু থেকে লাশ উদ্ধারের পর জেলা ডিবি পুলিশ ও কোতোয়ালী পুলিশ তদন্তে নামে। পুলিশ খুব দ্রুতই লাশের পরিচয় সনাক্ত করে ফেলে। এরপর পুলিশ খুনের রহস্য ও খুনীদের সর্ম্পকেও তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। এরপর ডিবি ও কোতোয়ালী পুলিশ আসামী গ্রেফতারে মাঠে নামে।

সোমবার গ্রেফতার করা হয় ইলিয়াছের শ্যালক ফারুক (৩০), মূল হত্যাকারী ইলিয়াছকে (৫৫), প্রাইভেটকারের চালক হান্নানকে (৬৫)।

পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মদ ভুঁইয়া বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে ৩ জুন রাতে গ্রামের বাড়িতে ওমর ফারুকের মরদেহ দাফন করা হয়। ওই হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা ইউসুফ আলী বাদী হয়ে ২ জুন রাতে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জড়িতদের গ্রেফতার করতেও সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না তা তদন্তের পর জানা যাবে।

মঙ্গলবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পুলিশের প্রেস ব্রিফিং শেষে হত্যাকান্ডের বিষয়ে সৌরভের বাবা ইউসুফ আলী কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে ভাইকে বাবার স্নেহ দিয়ে বড় করেছি, সে-ই আমার সন্তানকে হত্যা করল! আমার সন্তানকে না মেরে আমাকে মারত। তার কী এমন দোষ ছিল? শুধু কি আমার ছেলেই তোর (ইলিয়াস) মেয়েকে ভালোবেসেছে? তোর মেয়ে কি ভালোবাসে নাই? যদি তোর মেয়ে ভালো নাই বাসত, তাহলে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় গিয়ে কেন আমার ছেলেকে বিয়ে করল? সৌরভের বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে আমার ছোট ভাই আমাকে নানা হুমকি-ধমকি দিয়েছে। আমি এই হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত সবার ফাঁসি চাই।’

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সৌরভের মা মাহমুদা আক্তার। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ভালোবেসে চাচাতো বোনকে বিয়ে করাই আমার ছেলের কাল হয়েছে। আমরা কোনোদিন ভাবিনি, আপন চাচা তার ভাতিজাকে এভাবে হত্যা করবে! এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আমার সাজানো সংসার ছিল। ইলিয়াস সবকিছু এলোমেলো করে দিল।’

উল্লেখ্য, নিহত সৌরভের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার তারাটি গ্রামে। তার বাবার নাম ইউসুফ আলী। তিনি চাকরি করেন ডাক বিভাগে। মা মাহমুদা আক্তার পারুল গৃহিণী। সৌরভ গুলশানের বেসরকারি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার পরিবার স্থায়ীভাবে ঢাকায় মতিঝিলে বসবাস করেন।

সৌরভের সঙ্গে দীর্ঘদিন প্রেম চলছিল তার চাচাত বোন ইভার। উভয়ই পরিবারকে না জানিয়ে ১২ মে ঢাকার একটি বাসায় তারা বিয়ে করেন। এরপর ইভা ময়মনসিংহের নিজ বাসায় চলে আসেন। তাদের বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হতেই উভয় পরিবারের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। ১৬ মে ইভাকে জোর করে কানাডা পাঠিয়ে দেয় তার পরিবার। এর মধ্যেই ইভার বাবা ইলিয়াস আলী আপন বড় ভাই সৌরভের বাবা ইউসুফ আলীকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিলেন। ইভা ইলিয়াস আলীর একমাত্র মেয়ে।