স্টাফ রিপোর্টার : প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে বাইরে। করোনা সংক্রমণের তথ্য গোপন করে রোগীরা চিকিৎসা সেবা নিতে আসায় আক্রান্ত হচ্ছেন একের পর এক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মী। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ১৯ জন চিকিৎসক ও ২২জন নার্সসহ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৮৩জন। এ নিয়ে হাসপাতাল জুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

এমতাবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম জানান, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম ভেঙ্গে পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নেওয়ায় হাসপাতালের গাইনী লেবার ওয়ার্ড, কিডনী ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড, মেডিসিন ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ ও ওয়ানস্টপ সার্ভিসে করোনায় সংক্রমিত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্ধ করে দিতে হয়েছে কিডনী ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের সেবা কার্যক্রম।

এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচীপ ময়মনসিংহ শাখার নেতৃবৃন্দ। স্বাচীপ-ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি অধ্যাপক মতিউর রহমান ভুইয়া স্বাস্থ্য কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় মানসম্পন্ন পিপিই ও মাস্ক সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষীয় সূত্র জানায়, শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার এক প্রসূতি করোনা আক্রান্ত হওয়ার তথ্য গোপন করে সন্তান প্রসবের সেবা নিতে আসেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। করোনা শনাক্তের কোন স্ক্যানার মেশিন না থাকায় এই প্রসূুতি সহজেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ওয়ানস্টপ সার্ভিসের পরামর্শ ও সেবা নিয়ে ভর্তি হন গাইনী লেবার ওয়ার্ডে। সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের পর প্রসূতির অবস্থা খারাপ হলে তাকে নেয়া হয় হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-আইসিইউতে। আর নবজাতককে নেয়া হয় হাসপাতালের নব জাতক ওয়ার্ডে। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে প্রসূতি পাঠানো হয় সংক্রামক ব্যাধিক সূর্যকান্ত হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে। কিন্তু এরই মধ্যে এই প্রসূতির করোনায় সংক্রমিত হন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, গাইনী লেবার ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ এর একাধিক শিফটের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মী। আক্রান্ত হন লেবার ওয়ার্ডের রোগীরাও।

গাইনী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তায়েবা তানজিলা মির্জা জানান, প্রসূতির কারনে অপারেশন থিয়েটার ছাড়াও গাইনী লেবার ওয়ার্ডের ৩ শিফটের দুইট গ্রæপের চিকিৎসক ও নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত চিকিৎসক ও নার্সদের হোম কোয়ারান্টাইনে থাকার কারনে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক সেবাদান কার্যক্রম।

একই অবস্থা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ওয়ানস্টপ সার্ভিসের।

এর আগে হাসপাতালের কিডনী ডায়ালাইসিস ও হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে তথ্য গোপন করে রোগী ভর্তি হওয়ার কারনে সেখানেও ছড়িয়ে পড়ে এই করোনা ভাইরাস। আক্রান্ত হন চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরা। পাশাপাশি অন্যান্য রোগীও আক্রান্ত হয়েছেন।

রেফারেল চরিত্রের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ ছাড়াও পাশের সুনামগঞ্জ, উত্তরবঙ্গ, গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার রোগীরা চিকিৎসা সেবা নিতে আসছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও প্রতিদিন গড়ে বর্হিবিভাগে ৪০০ রোগী ও ২০০ রোগী আসছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ওয়ানষ্টপ সার্ভিসে। ভর্তি হচ্ছে গড়ে প্রতিদিন শতাধিত রোগী। করোনা আক্রান্ত কীনা এটি শনাক্তের কোন ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই সেবা দিচ্ছেন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরা। প্রতিনিয়ই এই ঝুঁকি বাড়ছে।

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও গফরগাঁও, মুক্তাগাছা ও হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ আশপাশের জেলার হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত হয়েছেন চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরা।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. এবিএম মশিউল আলম জানান, এ পর্যন্ত জেলায় ৩৫ জন চিকিৎসক ও ২৮ জন নার্সসহ ১০৬ জন স্বাস্থ্য কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।