স্টাফ রিপোর্টার : চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে বাসা বাড়ি ও গাড়িসহ অর্ধশত কোটি টাকার মালিক বনেছেন কথিত ব্যবসায়ী তুষার নন্দী। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজছে এই প্রতারককে। পুলিশের নজর এড়াতে ইতোমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছে তুষার নন্দী। চেক প্রতারণার অভিযোগে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানা ও আদালতে এক ডজনেরও বেশি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার আহমারউজ্জামান জানান, প্রতারনার অভিযোগে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে পুলিশকে।

ভুক্তভোগী স্থানীয় সূত্রগুলোর জানায়, ময়মনসিংহে আরেক শাহেদ এর নাম হচ্ছে প্রতারক তুষার নন্দী। পছন্দের জায়গা জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির লোভনীয় অফারের ফাঁদে ফেলে সহজ সরল মানুষের সঙ্গে অসংখ্য প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে এই তুষার নন্দীর বিরুদ্ধে। রয়েছে চেক জালিয়াতি ও ব্যবসার নামে মোটা অঙ্কের পণ্য সামগ্রী হাতিয়ে নেয়ার। এরকম অসংখ্য অভিযোগ মাথায় নিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করে গত এক দশক ধরে তুষার নন্দী প্রতারণা চালিয়েছে দাপটের সাথে। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্রেনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় তুষার নন্দী হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। প্রতারণার মাধ্যমে নগরীর কালিবাড়ি রোডসহ শহরতলীর চরকালিবাড়ি চায়না মোড়, জুট মিল গেট বাজার, বিসকা ও তারাকান্দায় নামে বেনামে প্রচুর জমি কিনেছেন। জুট মিল গেট এলাকায় বহুতল বাড়ি করেছেন। থাকেন নগরীর দুর্গাবাড়ি রোডের অভিজাত ফ্রেন্ডস টাওয়ারের ফ্ল্যাটে। রয়েছে একাধিক ব্যক্তিগত গাড়িও।

গত সোমবার এই প্রতারককে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে ভুক্তভোগীরা ডিআইজি-ময়মনসিংহ রেঞ্জ ও ময়মনসিংহ পুলিশ সুপারকে লিখিত নালিশ করার খবর পেয়ে গা ঢাক দিয়েছে প্রতারক তুষার নন্দী। অভিযোগের অনুসন্ধ্যাকালে তুষার নন্দীর প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে এসেছে। মোবাইল ফোনে অভিযোগের কথা অকপটে স্বীকার করে তুষার নন্দী জানায়, পুলিশের মধ্যস্থতায় টাকা ফেরত দেয়ার আলোচনা চলছে। অচিরেই সব ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেয়া হবে বলেও জানায় তুষার।

নগরীর কালিবাড়ি রোডের গৃহবধূ রেখা রায়কে পাঁচ শতাংশ জমি দেয়ার জন্য বায়না দলিলের ষ্ট্যাম্প চুক্তিতে গত ২০১৫ সালে নগদ ছয় লাখ সাত হাজার টাকা নেয় নগরীর ২ নম্বর কালিবাড়ি রোডের প্রয়াত বঙ্কিম নন্দীর পুত্র ব্যবসায়ী তুষার নন্দী। কিন্তু এক বছরেও জমি রেজিষ্ট্রি করে দিতে না পারায় টাকার জন্য রেখা রায় চাপ দিলে গত ২০১৬ সালে তুষার নন্দী ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক-ইউসিবিএল,ময়মনসিংহ শাখার অনুকূলে ছয় লাখ সাত হাজার টাকার চেক দেয়। ব্যাংক হিসাবে কোন টাকা না থাকায় এই চেক ডিজ অনার হলে ময়মনসিংহ আদালতে মামলা করেন রেখা রায়। মামলাটি বিচারাধীন।

একই কায়দায় নগরীর পুলিশ লাইন কাশর এলাকার গৃহবধূ শিল্পী মহন্তকে চার শতাংশ জমি বিক্রির ফাঁদে ফেলে চলতি সালে তুষার নন্দী নগদ ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা নেয়। কিন্তু জমি রেজিষ্ট্রি করতে টালবাহানা শুরু করলে টাকা ফেরত চান শিল্পী মহন্ত। এক পর্যায়ে তুষার নন্দী ঢাকার ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড শাখার অনুকূলে ১০ লাখ টাকার চেক দেন। কিন্তু ওই হিসাবে কোন টাকা না থাকায় চেক ডিজ অনার হয়। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে উল্টো তুষার নন্দী মারধর করাসহ প্রাণনাশের হুমকি দেয় শিল্পীকে। এই ঘটনায় শিল্পী মহন্ত কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। তুষার নন্দীর বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানায় ও ময়মনসিংহ আদালতে এরকম চেক জালিয়াতি ও প্রতরণার অভিযোগ করেছেন শম্ভূগঞ্জ পূর্ব বাজারের অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট আব্দুস সালাম, চরকালিবাড়ি গ্রামের হাবিবুর রহমান ও আলমগীর হোসেন, চরলক্ষীপুর গ্রামের আলামিন মিয়া, চরপুলিয়ামারি গ্রামের মাজহারুল ইসলাম জুয়েল এবং টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার পাকুটিয়া গ্রামের লিয়াকত আলী খানের পুত্র রাজিব খানসহ আরও অনেকে। এর মধ্যে হাবিবুর রহমানের সাথে ৭০ লাখ টাকার প্রতারণার অভিযোগ তুষার নন্দীর বিরুদ্ধে। অনেকের কাছ থেকে বাকীতে চালসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী নিয়ে টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।

এভাবে প্রতারণা ও চেক জালিয়াতির মাধ্যমে তুষার নন্দী অর্ধ শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনেছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। ভুক্তভোগীরা আরও জানায়, কখনও আইনজীবী, কখনও সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে থাকে তুষার নন্দী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্টতা রয়েছে বলেও প্রচার করে। ভয়ংকর এই প্রতারকের গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর এমদাদুল হক মন্ডলের উপস্থিতিতে চরকালিবাড়ি গ্রামে অধশর্ত ভুক্তভোগীসহ কয়েকশ’ মানুষ সমাবেশ করে।