আতাউর রহমান জুয়েল : করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কাজ ও মজুরি কমে যাওয়ায় ভালো নেই ময়মনসিংহের প্রতিমা তৈরির কারিগররা। অর্থাভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ফলে যুগ যুগ ধরে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবন কাটছে কোনোমতে। অনেকে আবার বাধ্য হয়ে পেশাও বদল করছেন।

প্রতিমা কারিগর দিলীপ পাল, ময়মনসিংহ মহানগরীর নতুন বাজার এলাকার পাল সম্প্রদায়ের এই বনেদি কারিগর গত ৫০ বছর ধরে আঁকড়ে আছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা প্রতিমা তৈরির কাজ। কিন্তু এখন আর আগ্রহ নেই এই কাজে। কারণ করোনাকালীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর প্রতিমা তৈরির উপকরণ সামগ্রীর দাম বাড়ায় তাল মেলাতে পারছেন না। ফলে প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়ে হতাশ তিনি। তিনি আরো জানান, করোনাকালীন এবার প্রতিমা তৈরির অনেক কমেছে। গতবার যেখানে ৩২টি পূজা মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছিলেন। এবার করোনার প্রভাবে সেই জায়গায় মাত্র ২৬টি প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছেন।

প্রতিমা তৈরিতে বাঁশ, খড়, কাঠ, মাটি, সুতলিসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় প্রতিমা তৈরির মজুরি না বেড়ে কমে গেছে। আগে যেখানে ৪০-৫০ হাজার টাকায় একটি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরি অর্ডার পাওয়া যেত, এবার সেখানে নেমে এসেছে ২৫-৩০ হাজার টাকায়।

করোনাকালীন প্রতিমা তৈরির ন্যূনতম মজুরি না পাওয়ায় ময়মনসিংহের অন্যান্য কারিগরদের মাঝেও বিরাজ করছে হতাশা। অনেকে আবার বাপ-দাদার পেশা বদলে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

জুবলিঘাট এলাকার প্রতিমা কারিগর নিখিল চন্দ্র পাল (৬০) জানান, করোনায় মজুরি কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর এই পেশা ছেড়ে হকারি, মুদি দোকানিসহ নানা পেশায় চলে যাচ্ছেন। এবার প্রতিমা তৈরিতে কারিগর সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি আরও জানান, পূজার উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরি করে কারিগরদের মজুরি পরিশোধের পর হাতে আর কিছুই থাকছে না। বিশেষ করে বিভিন্ন মণ্ডপের পূজা পরিচালনার কমিটির সদস্যরা এবার প্রতিমা তৈরিতে আগের মতো আর টাকা দিচ্ছেন না। তারা বলছেন, করোনার প্রভাবে এবার পূজার কাঙ্খিত চাঁদা উঠাতে পারছেন না তারা।

ময়মনসিংহ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট বিকাশ রায় জানান, প্রতিমা কারিগরদের আর্থিক সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় পৃষ্টপোষকতা ও সামাজিক মর্যাদা দিতে না পারলে, এক সময় সমাজ থেকে প্রতিমা কারিগর হারিয়ে যেতে পারে।

জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা জানান, করোনাকালীন প্রতিমা কারিগরদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় আর্থিক সহায়তা দিতে না পারলে এই পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমলে নেবেন এমনটাই প্রত্যাশা এই নেতার।

প্রতিমা কারিগরদের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পৃষ্টপোষকতার উদ্যোগ নেবে সরকার, বাঁচিয়ে রাখবে ঐতিহ্যের এসব কারিগরদের এরকম প্রত্যাশা সবার। কোনোরকম জাকজমক ছাড়াই এবার জেলায় ৭৭০টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে।