অনলাইন ডেস্ক : প্রয়াত হলেন বিশ্বের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। থেকে গেল শতাব্দীর সেরা গোল, ‘হ্যান্ড অফ গড’, অসংখ্য মন মাতানো ড্রিবল, ছোটোখাটো চেহারায় ডিফেন্ডারদের মাত দিয়ে অসংখ্য গোলের স্মৃতি। কিন্তু থাকলেন না সেইসব ইতিহাসের স্রষ্টা দিয়েগো ম্যারাডোনা।

ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৯৬০ সালে। বুধবার (২৫ নভেম্বর) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

বুয়েন্স আয়ার্স রাজ্যের একটি শহর লেনাসের এভিটা হাসপাতালে। লাতিন আমেরিকার আর আট-দশটা ফুটবলারের গল্পের মতোই ম্যারাডোনার উঠে আসার গল্পটা।

খুবিই দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। জীবিকার সন্ধানে তার মা-বাবা কোরিয়েন্তেস রাজ্য থেকে পাড়ি জমিয়ে আসেন লেনাসে। তবে তিনি বেড়ে ওঠেন বুয়েন্স আয়ার্সের এক উপশহর ভিলা ফিওরিটোয়। মা-বাবার প্রথম চার কন্যার পর জন্ম হয় ম্যারাডোনার। তারপর আরও দুটি ভাই রয়েছে ম্যারাডোনার। একজনের নাম হুগো, অন্যজনের নাম রাউল। দুজনই ছিলেন পেশাদার ফুটবলার।

আট বছর বয়সেই ম্যারাডোনার ফুটবল প্রতিভা ফুটে ওঠে। বাড়ির পাশের ক্লাব এস্ট্রেলা রোজার হয়ে খেলতে গিয়ে নজরে পড়েন ট্যালেন্ট হান্টিং স্কাউটদের। বুয়েন্স আয়ার্সের দল আর্জেন্টিনো জুনিয়রের হয়ে ১২ বছর বয়সে প্রথম বিভাগের একটি ম্যাচের প্রথমার্ধের পর মাঠে নামেন ম্যারাডোনা। ওই অর্ধেকটা সময়ে যে ঝিলিক তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটাই তাকে বিশ্বসেরার আসনে বসার প্রথম পথ দেখিয়ে দিয়েছিল।

ব্রাজিলিয়ান প্লে মেকার রিভেলিনো এবং ইংল্যান্ডের ক্লাব ম্যানইউ উইঙ্গার জর্জ বেস্ট ছিলেন তার আদর্শ। তাদের দেখেই খেলা শিখেছিলেন বলা যায় ম্যারাডোনা।

media image
ফাইল ছবি

একজন আর্জেন্টিনীয় ফুটবল কোচ সেইসাথে একজন ম্যানেজার এবং প্রাক্তন খেলোয়াড়। অনেক বিশেষজ্ঞ, ফুটবল সমালোচক, প্রাক্তন ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং ফুটবল সমর্থক তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে গণ্য করেন। তিনি ফিফার বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ে পেলের সাথে যৌথভাবে ছিলেন।

ম্যারাডোনাই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুইবার স্থানান্তর ফি এর ক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। প্রথমবার বার্সেলোনায় স্থানান্তরের সময় ৫ মিলিয়ন ইউরো এবং দ্বিতীয়বার নাপোলিতে স্থানান্তরের সময় ৬.৯ মিলিয়ন ইউরো। নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া এবং নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি তার নাপোলিতে কাটানো সময়ের জন্য বিখ্যাত, যেখানে তিনি অসংখ্য সম্মাননা জিতেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ৯১ খেলায় ৩৪ গোল করেন।

তিনি চারটি ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। যার মধ্যে ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বর্ণগোলক জিতেন তিনি। প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২–১ গোলে জয় লাভ করে।

আর্জেন্টিনার পক্ষে উভয় গোলই করেন ম্যারাডোনা। দুইটি গোলই ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে দুইটি ভিন্ন কারণে। প্রথম গোলটি ছিল হ্যান্ডবল যা “হ্যান্ড অফ গড” নামে খ্যাত। দ্বিতীয় গোলটি ম্যারাডোনা প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে ড্রিবলিং করে পাঁচজন ইংরেজ ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে করেন। ২০০২ সালে ফিফা ডটকম এর ভোটাররা গোলটিকে শতাব্দীর সেরা গোল হিসাবে নির্বাচিত করে।

ম্যারাডোনাকে ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সংবাদ হিসেবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের অন্যতম মনে করা হয়। ১৯৯১ সালে ইতালিতে ড্রাগ টেস্টে কোকেইনের জন্য ধরা পড়ায় ১৫ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হন তিনি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইফিড্রিন টেস্টে ইতিবাচক ফলাফলের জন্য তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে তিনি তার কোকেইন নেশা ত্যাগ করেন। তার কড়া রীতি মাঝেমাঝে সাংবাদিক এবং ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের সাথে তার মতভেদের সৃষ্টি করে। ম্যানেজার হিসেবে খুব কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ২০০৮ সালের নভেম্বরে তাকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১০ বিশ্বকাপের পর চুক্তি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আঠারো মাস এই দায়িত্বে ছিলেন।

media image
ম্যারাডোনা

ম্যারাডোনার ক্লাব ক্যারিয়ার:

আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স (১৯৭৬-১৯৮১): ১৬ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার ক্লাবের হয়ে পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন ম্যারাডোনা। চার বছর ক্লাবটির হয়ে খেলেন তিনি। এ সময়ে বা পায়ের জাদু আর সম্মোহনী শরীরের দোলায় প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের বোকা বানিয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দেন তিনি। আর্জেন্টিনোসের হয়ে ১৬৭ ম্যাচে ১১৬ গোল করেন তিনি।

বোকা জুনিয়র্স (১৯৮১-১৯৮২): পাঁচ বছরে নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রতিভার ফুটবলার হিসেবে প্রমাণিত করা ম্যারাডোনাকে ১৯৮১ সালে দলে ভেড়ায় আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব বোকা জুনিয়র্স। যদিও ক্লাবটির হয়ে বেশিদিন খেলা হয়নি তার। বোকা জুনিয়র্সে এক বছরে ৪০ ম্যাচ খেলে ২৮টি গোল করেন ফুটবলের এই মহারাজা।

বার্সেলোনা (১৯৮২-১৯৮৪): বোকা জুনিয়র্সের ম্যারাডোনাকে মনে ধরে লা লিগার দল বার্সেলোনার। ১৯৮২ সালে তাকে দলে ভেড়ায় কাতালানরা। যদিও এই অধ্যায়টি তার বর্ণিল হয়নি। দুই বছরে বার্সার হয়ে ৩৬ ম্যাচে ২২টি গোল করেন ম্যারাডোনা।

নাপোলি (১৯৮৪-১৯৯১): ইতালিয়ান এই ক্লাবটির হয়ে সবচেয়ে মধুর সময় কাটিয়েছেন ম্যারাডোনা। ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার আর্জেন্টাইন এই ফুটবল ঈশ্বর। ৭ বছরে নাপোলির হয়ে ১৮৮টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি, গোল করেছেন ৮১টি। যা ক্লাবটির ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ।

সেভিয়া (১৯৯২-১৯৯৩): লা লিগার দল বার্সেলোনা থেকে নাপোলি যাওয়া ম্যারাডোনা ১৯৯২ সালে আবারও লা লিগায় ফেরেন। এবার তার ঠিকানা হয় সেভিয়ায়। লা লিগায় এবারের পথটাও দীর্ঘ হয়নি তার। এক বছরে সেভিয়ার হয়ে ২৬টি ম্যাচ খেলে ৫ গোল করেন তিনি।

নিওয়েল'স ওল্ড বয়েজ (১৯৯৩-১৯৯৪): সেভিয়াতেই থাকতেই ক্যারিয়ার পড়তে শুরু করেন ম্যারাডোনার। অন্যদিকে না ভেবে তাই ১৯৯৩ সালে দেশের ফুটবলে ফেরেন কিংবদন্তি এই ফুটবলার, খেলতে শুরু করেন নিওয়েল'স ওল্ড বয়েজের হয়ে। এখানে নিয়মিত খেলা হয়নি তার। মাত্র ৫টি ম্যাচে খেলে গোলশূন্য থাকেন মেসি-আগুয়েরোদের এই অগ্রজ।

বোকা জুনিয়র্স (১৯৯৫-১৯৯৭): ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাদক পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেন ম্যারাডোনা। কোনো ক্লাবই তার প্রতি আর আগ্রহ দেখায়নি তখন। এমন সময়ে হাত বাড়ায় তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে দল বোকা জুনিয়র্স। এই ক্লাবটির হয়ে আরও দুই বছর খেলেন ম্যারাডোনা। ৩০ ম্যাচ খেলে করেন ৭ গোল। ১৯৯৭ সালে বুটজোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ম্যারাডোনার জাতীয় দলের ক্যারিয়ার:

ফুটবল ইতিহাসেই যিনি অমরত্ব লাভ করেছেন, তিনি যে আর্জেন্টিনার ফুটবলের সর্বকালের সেরা; সেটা বলাই বাহুল্য। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব জয়ের মুকুট এনে দেন ম্যারাডোনা। ওই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ছিলেন জাদুকরের ভূমিকায়। কোনো বাধাই তার সামনে শেষপর্যন্ত টেকেনি। ভুবন ভোলানো ফুটবল খেলে দলকে ফাইনালে তোলেন এই ফুটবল জাদুকর। জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে হাত দিয়ে গোল করে দলের শিরোপা নিশ্চিত করেন তিনি। যে গোলটি 'হ্যান্ড অব গড' নামে পরিচিত।

১৯৯০ বিশ্বকাপেও অপ্রতিরোধ্য ছিলেন ম্যারাডোনা। এবারও দলকে ফাইনালে তোলেন তিনি। কিন্তু এবার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষেই হেরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় থেকে বঞ্চিত হন তিনি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম ভরসা ছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হন তিনি।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে ৯১টি ম্যাচ খেলেছেন ম্যারাডোনা, গোল করেছেন ৩৪টি। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বমাত করার আগে আর্জেন্টিনা যুব দলের হয়ে ১৯৭৯ সালে শিরোপা জেতেন ম্যারাডোনা।